ছোটোবেলাটা অনেক মজার তাইনা? বড়রাই খালি ছোটবেলার মজাটা বুঝতে পারে। কিন্তু টাইম মেশিনে করে ছোটবেলায় ফিরে যাওয়াতো আর সম্ভব না, তাই ছোটবেলার কথা মনে করেই খুশি থাকতে হবে। কিন্তু কইদিনই বা মনে থাকবে সেই মজার দিনের কথাগুলি? তাই যতটুকু মনে আছে, ততটুকুই লিখে রাখছি। ডাইরি লেখার অভ্যেস নেই, তাই ব্লগটাকেই না হয় ডাইরি হিসেবে ব্যবহার করলাম। আর একসাথে তো সব কথা লিখে ফেলা সম্ভব না, তাই খন্ড খন্ড করে লিখছি।

আমাদের স্কুল ছিল ৩ কিলোমিটার দূরে। আর কাঁচা রাস্তা তো অবশ্যই। বর্ষার দিনে অই ৩ কিলোমিটার রাস্তা হয়ে যেতো ৬ কিলোমিটার। তখনো আমার সাইকেল হয়নি। তাই দলবেঁধে হেটে হেটে যাওয়টাই একমাত্র উপায় ছিলও। দল বেধে বলতে যাদের সাইকেল নেই তাদের দল আরকি। স্কুল জীবনের অই রাস্তাটুকুতেই অনেক মজা করেছি। এখন মনে হয় সাইকেল না থেকেই ভালো ছিলও, এখন অনেক ইচ্ছে করে আবার অই রাস্তা দিয়ে হাটি। কিন্তু সম্ভব না, কারন অই রাস্তা দিয়ে হাটার মতো কোন উপযুক্ত কারন নেই । তো একবার আমাদের এলাকার সংসদ সদস্য ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বর্ষার সময় পুরো রাস্তা এক ধাপ পরপর একটা করে ইট বিছিয়ে দিবেন। আমরা এমন খুশি হয়েছিলাম যে বলার মতো না। আমরা সবাই স্বেচ্ছায় ভলান্টিয়ার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের আর কাজ করতে হয় নি, কারন অই প্রজেক্টটাই বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। কারন হিসেবে বলা হয়েছিল যে, আজকে ইট বিছালে কাল্কেই আর খুজে পাওয়া যাবে না ইটগুলি। কি আর করা, সরকারের লোকগুলি অনেক গরীবতো তাই অদের দোষ না দিয়ে মেনে নিয়েছিলাম। এখন বুঝতে পারি, আসলে উনার কোন ইচ্ছেই ছিল না ইট বিছানোর। আসলে স্কুলে এসে কিছু একটা বলতে হবে তাই বলেছিলেন।

বর্ষার দিনে যেমন এক হাটু কাদা হতো, তেমনি গরমের সময় হতো এক হাটু ধুলো। সেই ধুলতে ধুলো উড়িয়ে উড়িয়ে হাটার মজাই ছিলও অন্য রকম। স্কুলে যাওয়ার পর প্যান্টের নিচের অংশ হতো দেখার মতো। প্যান্ট কালো রঙের নাকি সাদা রঙের, বুঝার উপায় থাকতো না।

আমার ক্লাস ফ্রেন্ড এবং ক্লাস শত্রু ছিল। মজার বিষয় দুইজন একি মানুষ। আমরা দুইজন প্রতিদিনই পাশাপাশি বসতাম। স্যার ক্লাস থেকে বেড়িয়ে যাবার সাথে সাথে মারামারি শুরু করে দিতাম। না, ইয়ার্কি করে মারামারি না। সত্যি সত্যি মারামারি করতাম। কিন্তু আবার ক্লাস শুরু হলেই, একসাথে বসে যেতাম। অনেক সময় কোন স্যার দেখে ফেলত, আমাদের মারামারির দৃশ্য। ফলে মাঝে মাঝে স্যারের হাতের মার পড়ত বোনাস হিসেবে।

স্কুল জীবনটা আমার অনেক আনন্দে কাটেনি। বাবা-মা সাথে থাকতো না, থাকতাম মামা বাড়ি। একজন টিন এজের জন্য এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না। বাবা-মার আদর ভালোবাসা পাওয়ার সময়টাই তো টিন এজ।

আমার মামারা অনেক ভালো ব্যবহার করলেও, মামাতো ভাইরা আমার সাথে কেমন জানি ব্যবহার করতো। সবাই যেহেতু এক ক্লাসে পরতাম, সেহেতু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তারা বোধই আমার বাড়ি-ঘর নেই বলে, তাদের সাথে মিশতে দিতে লজ্জা পেতো।

আমার আব্বু আমি অনেক ছোট থাকতেই আমার দাদা বাড়ির সাথে রাগারাগি করে চলে আসে, ফলে আমাদের বাড়ি-ঘর নেই বললেই ভালো হয়। আমার চাচারা-ফুফুরাও কখনো আমাদের খজ নেয় নি। এখন হাসি পায় যখন চাচারা-ফুফুরা আদর করতে আসে। তাদের প্রতি আমার তেমন কোন আগ্রহ নেই আর। তাদেরকে আমার আত্মীয় বলে আমি স্বীকারও করি না। আমার ছেলেবালার দুরবস্থার জন্য দ্বায়ই তারাই। আমার বাবার আয় করা টাকা দিয়ে তারা আজ এই অবস্থানে এসেছে, আর আমাদের বড় হতে হয়েছে মানুষের বাড়িতে অবহেলায়।

যাই হোক, এগুলি আর মনে করতে চাই না। এসব কথা মন থেকে হারিয়ে গেলেই বরং ভালো হবে। এখন একটাই সান্ত্বনা যে, দাদার বাড়ির হোক আর মামার বাড়ির হোক কেউই আমার মতো নিজের পায়ে এখনো দাঁড়াতে পারেনি। এবং এখন ওদের ওখানে গেলে সম্মান পেয়েই চলি।

সবার অবস্থা সব সময় এক থাকে না, আমার অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। শুধু কাটা ঘায়ের মতো জ্বল জ্বল করছে ছেলেবেলার স্মৃতিটা।