আজ সকাল থেকেই ফেসবুকে হৈচৈ পরে গেছে। কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না যে এমন কিছু একটা ঘটবে। সবার চোখ কপালে উঠে গেছে, এটা কি করে সম্ভব? যাকে তিনদিন ধরে মৃত ভাবা হচ্ছিলো, সে কিভাবে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়? তার একনিষ্ঠ ভক্তরা তার জন্য স্পেশাল জানাজার ব্যবস্থা করেছিলো। তাহলে কি সেই জানাজা নামাজ টা আর পড়া হবে না? সে কি মারা যায় নি?

ছোট্ট একটি গ্রামের স্কুল টিচার মীর মোহাম্মদ জাফর সাহেব। বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও, শিশু-কিশোরদের জন্য প্রচুর গল্প, সায়েন্স-ফিকশন লিখেছেন জাফর সাহেব। তিনি তিনদিন আগে মারা গেছেন। কিন্তু জাফর সাহেব বিশ্বাস ই করে উঠতে পারছেন না যে তিনি মারা গেছেন। বেচে থাকতে নাস্তিক বলে নিজেকে পরিচয় দিলেও, মরার পরে বেহেস্তে যাওয়ার খায়েস জেগেছে তার মনে। তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না যে, তিনি ভুত হয়ে পৃথিবীতেই আটকে আছেন। তার ভুত হয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। তিনি সবাইকে দেখতে পাচ্ছেন, শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না।

জাফর সাহেব অনেক ভীতু প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি সামান্যতেই ভয় পেয়ে যেতেন। যেমন, তিনি খবরের কাগজ একবারে পড়তে পারতেন না। হেডলাইন দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতেন, পরে ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় করে পড়তেন। এখন একা একা তার ভয় লাগছে। এখনো কোন ভূতের সাথে দেখা হয় নি তার। সিলেট ভুত সঙ্গী থেকে খুজতে খুজতে প্রায় ঢাকায় চলে এসেছেন জাফর সাহেব, তবুও কোন ভূতের সন্ধান তিনি পাননি। এটা তো অসম্ভব, এতক্ষণে তো পাঁচ-ছয়টা ভুতের সাথে দেখা হয়ে যাওয়া উচিৎ। এটা থেকে তার ধারনা হয়েছে যে তিনি বোধয় পুরোপুরি মরেন নি। তাই তিনি ঢাকায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিলেন।

ঢাকায় প্রবেশের পর জাফর সাহেব সোজা চলে গেলেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। সেখানকার নিরিবিলি পরিবেশ জাফর সাহেবের খুব পছন্দ। জি ব্লকের একটা বড় গাছের নিচের বসে পরলেন জাফর সাহেব। তার খুব ক্লান্তি লাগছে। হেটে হেটে সিলেট থেকে ঢাকায় এসেছেন। তাছাড়া ঢাকার অবস্থা ভালো না এখন। ছাত্র-ছাত্রীরা কিসব আন্দোলন-ফান্দোলন করছে। জাফর সাহেব মনে মনে ভাবলেন, এদেরকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তারা থাকবে স্কুলে, রাস্তায় তাদের কাজ কি? দেশ চালানোর জন্য তো সরকার রয়েছেই। হটাত তার মনে পরলো তার এই আন্দোলন নিয়ে কিছু লেখা উচিৎ। হাজার হোক, জাফর সাহেব একজন স্কুল শিক্ষক। ভাবতে ভাবতে পকেট থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অবদান স্মার্টফোন টা বের করে ফেললেন।

চটী সাইজের একটা স্ট্যাটাস লিখে ফেললেন জাফর সাহেব। স্ট্যাটাস টা পোষ্ট করে তার বিশ্ববিখ্যাত মুচকি হাসিটা দিলেন জাফর সাহেব। পাতার পর পাতা গল্প লিখেছেন তিনি আগে, এরকম স্ট্যাটাস দেয়া তো তার কাছে নস্যি।

খুব ক্লান্ত জাফর সাহেব, ঘুমে চোখ বুজে আসছে। আর থাকতে পারলেন না, গভীর ঘুমে ঢলে পরলেন। ঘুমানোর সাথে সাথেই REM হওয়া শুরু হল। নিশ্চয় স্বপ্নে নতুন কোন ইংরেজি সায়েন্স ফিকশন পড়ছেন। ভালো কোন সায়েন্স ফিকশন দেখলেই জাফর সাহেবের চোখ চকচক করে। কেনো করে কে জানে।

হটাত জাফর সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেলো, কে যেনো তার নাম ধরে ডাক দিলো। ততক্ষণে চারিদিকে অন্ধকার হয়ে গেছে, মাঝরাত হয়ে গেছে নিশ্চয়। জাফর সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন। ডাকটা এবার স্পষ্ট শুনতে পেলেন। তিনি যেই গাছের নিচে শুয়ে আছেন, সেই গাছের উপর থেকে অস্বাভাবিক একটা কন্ঠ ভেসে আসছে। বারবার শুধু একই কথা বলছে গাছের উপরের লোকটা, “জাফর সাহেব কেমন আছেন?”

জাফর সাহেব এবার সিরিয়াস লেভেলের ভয় পেয়ে গেলেন। ভুত ভুত বলে চিৎকার করে উঠলেন। জাফর সাহেব ঘটনার আকস্মিকতায় ভুলে গেছেন যে তিনিও একটা ভুত। ভুত দেখে তার ভয় পাবার কোন কারন নেই। কিন্তু ভয় তো আর লজিক মানে না, তার উপর নতুন নতুন ভুত হয়েছেন জাফর সাহেব।

গাছ থেকে সেই অস্বাভাবিক কন্ঠের ভুতটি নেমে এলো। এসে করমর্দনের জন্য হাত বারিয়ে দিয়ে বলল, ভয় পাবেন না জাফর ভাই, আমাকে চিনতে পারেন নি?

জাফর সাহেব ততক্ষণে একটু সাহস ফিরে পেয়েছেন। বললেন, ভালো আছি। কিন্তু করমর্দনের সাহস করতে পারলেন না। কাপতে কাপতে প্রশ্ন করলেন, আপনি কে ভাই? উত্তরে ভুতটি পিলে চমকানো একটা ভয়ানক হাসি দিলো।

হাসি শেষ হওয়ার পর ভুতটি বললো, আমারে চিনতে পারলা না জাফর মাস্টার? আমি সোলায়মান, ভূতের বাচ্চা সোলায়মান।

জাফর সাহেব চমকে উঠলেন, সোলায়মান ভুতকে নিয়ে অনেক হাসি তামাশা করেছে কিছুদিন আগে। জাফর সাহেব কাপতে কাপতে বললেন, আমাকে কিছু করো না ভাই। আমাকে মাফ করে দাও, আর কোনদিন তোমাকে নিয়ে কিছু লিখবো না।

সোলায়মান হাসতে হাসতে বললো, তোর আর লেখার ক্ষমতা আছে? আর লেখলেও তোর লেখা আর কেউ পরবে বলে ভাবছিস? পুরো দেশ এখন তোর উপর ক্ষেপে আছে। তুই মরে গিয়ে বেচে গেছিস। তুই ও এখন আমার মতো ভুত, ভূতের বাচ্চা জাফর মাস্টার। আবার সেই বিকট হাসি।

জাফর মাস্টার এবার তার প্যান্ট নষ্ট করে ফেললো। এমন ভয় সে আর কখনো পায় নি। সে কেঁদে উঠে বললো, তুমি কি আমাকে মেরে ফেলবে সোলায়মান ভাই? বলেই গুঙিয়ে কাদতে লাগলো।

সোলায়মান কোন উত্তর দিলো না। জাফর মাস্টারের কানে ধরে তাকে গাছের সাথে উলটো করে ঝুলিয়ে রেখে সে তার বিকট হাসি দিতে দিতে উধাও হয়ে গেলো।

জাফর মাস্টার বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। সে নতুন ভুত হয়েছে, ভূতদের ক্ষমতা কিভাবে কাজে লাগাতে হয় সে জানে না। কোন উপায় না পেয়ে সে উল্টো হয়ে কাদতে থাকলো। কাদতে কাদতে এক সময় ঘুমিয়ে পরলো জাফর মাস্টার।

সকাল হয়ে গেছে, পাশের বাসা থেকে কে যেনো সুরে সুরে দিলবার নামের কাউকে ডাকছে। সে ডাকাডাকির শব্দে জাফর মাস্টারের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘুম কাটানোর জন্য শরীর টা একটু মোচড় দিলো। আর মোচড় দিয়েই দারুন একটা জিনিস আবিস্কার করলো। হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে যেদিকেই মোচড় দেয়া যায় সেদিকেই শরীরটা ঘুরে যায়। দারুন আবিস্কার, সে খুশি হাতে কিল মারলো। আরো নতুন নতুন ক্ষমতা আবিস্কারের নেশা চাপলো তার মাথায়।

জাফর মাস্টার ধীরে ধীরে অনেক গুলি ক্ষমতা শিখে গেলো। যেমন, লাটিমের মতো ঘোরা, ডিগবাজি দেয়া, শুন্যে উঠা-নামা, ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হওয়া, ইত্যাদি। ক্ষমতাগুলি জানার পর অনেকটা সাহস পেলো সে। খুশিমনে সে যমুনা ফিউচার পার্কের দিকে হাটতে শুরু করলো। অনেকদিন যাওয়া হয় না সেখানে। কিডস জোনে একবার ঢু মেরে আসা যাবে। সে মুরুব্বি হলেও তার মনস্তাত্ত্বিক বয়স বাড়েনি। সে এখনো শিশুই রয়ে গেছে। শিশুদের একটু ভয় দেখিয়ে আসা যাবে।

যমুনা ফিউচার পার্কের কিডস জোনে গিয়ে জাফর মাস্টার দেখেন বেশ কয়েটা বাচ্চা খেলা-ধুলা করছে। জাফর মাস্টার ভয়ঙ্কর রুপ ধারন করে হালুম বলে বাচ্চাদের মাঝে গিয়ে পরলো। বাচ্চারা হকচকিয়ে গেলেও ভয় পেলো না মোটেও। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব বাচ্চারা জাফর মাস্টারকে ঘিরে দাড়ালো। জাফর মাস্টার আরেকবার হালুম বলে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলো। বাচ্চারা হেসে উঠলো।

বাচ্চারা ধীরে ধীরে জাফর মাস্টারের দিকে এগিয়ে আসছে। জাফর মাস্টার ভয় পাচ্ছেন। বাচ্চাদের মতিগতি ভালো মনে হচ্ছে না। বাচ্চাদের মুখে শয়তানি হাসি দেখা যাচ্ছে। জাফর মাস্টার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু তখন তার মনে হল, আরে এই জিনিষটা তো এখনো শিখিই নি। অদৃশ্য হওয়ার পদ্ধতি না শিখে মানুষের সামনে আসা ভুল হয়েছে। বাচ্চারা অনেক কাছে এসে গেছে। জাফর মাস্টার ঘামতে শুরু করলেন। দুইটা বাচ্চা জাফর মাস্টারের দুই কান ধরে টানাটানি শুরু করলো। জাফর সাহেব কেঁদে উঠলেন। জাফর মাস্টার তার লেখা গল্পগুলিতে বাচ্চাদের দুষ্টু হিসেবেই সবসময় দেখিয়েছেন, কিন্তু তিনি যে এই দুষ্টুমির শিকার হবেন ভাবেন নি কখনো। এতক্ষণে আরেকটি বাচ্চা এসে তার গোফ ধরে টানা শুরু করলো। জাফর মাস্টার ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো।

জাফর মাস্টারের চিৎকার শুনে কয়েকজন বড় মানুষ চলে আসলো। তারা এসে দেখে একজন বুড়ো মানুষ ভূতের মতো সেজে বাচ্চাদের মাঝে বসে আছে। তারা দ্রুত বাচ্চাদের সরিয়ে নিলো। একজন মোটাসোটা মহিলা এসে জাফর মাস্টারের গালে সুমো পালোয়ানদের মতো চড় কষিয়ে দিয়ে বলল, বুইড়া বয়সে এসব কি? সং সাইজা পুলাপানরে ভয় দেখান লজ্জা করে না? মহিলার মাইকের মতো কন্ঠ শুনে ৫০-৬০ জন মানুষ ছুটে এলো। রীতিমতো ভিড় জমে গেলো কিডস জোনে।

বাংলাদেশের মানুষ অতি উৎসাহী, একে একে ২০-৩০ জন জাফর মাস্টারের গালে চড় দিয়ে গেলো। জাফর মাস্টার কষ্টে-অপমানে পাথর হয়ে বসে থাকলো। একজন একজন করে এগিয়ে আসছে আর চড় মেরে চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে একজন ফোটোগ্রাফার হাজির হলেন। একজন চড় মারে আর সেই ফোটোগ্রাফার ছবি তুলে আর বিড়বিড় করে বলে, হাসিহাসি মুখ না হলে কি সুন্দর ছবি উঠে? হাসতে হবে ম্যান হাসতে হবে।

বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো পুলিশ হাজির হয়ে গেলো। কেউ একজন নাকি থানায় ফোন করে বলেছে যে এখানে ছেলেধরা ধরা পড়েছে একটা। পুলিশ ভিড় ঠেলে সোজা জাফর মাস্টারের কাছে চলে গেলো। সবাইকে সরিয়ে দিয়ে জাফর মাস্টারের সামনে গিয়ে বসলো পুলিশ অফিসার। জাফর সাহেব মনে মনে খুশি হলেন, ভাবলেন নিজেদের লোক পাওয়া গেলো। পরিচয় দিলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। পরিচয় দেয়ার জন্য যেই মুখ খুলেছে জাফর মাস্টার, অমনি চড়। পুলিশের হাতের চড় খায়নি কোনদিন জাফর মাস্টার। পুলিশের চড় খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পরে গেলো সে।

জাফর মাস্টারের জ্ঞান ফিরলো পুলিশ ভ্যানে। সে চোখ মেলেই চিৎকার করে উঠলো। তার সামনে সোলায়মান ভুত বসে আছে। সোলায়মান তার দিকে কিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। জাফর মাস্টার দ্রুত পুলিশদের দিকে তাকালো, দুজন পুলিশ অগ্নি দৃষ্টিতে তারদিকে তাকিয়ে আছে। এই মারবে এই মারবে ভাব। এক পুলিশ আরেক পুলিশকে বললো, এর মাথাকে ধরতে হবে। থানায় নিয়ে দুইটা ডলা দিলেই সব বলে দিবে। বোঝাই যাচ্ছে পুলিশেরা সোলায়মানকে দেখতে পাচ্ছে না। জাফর মাস্টার ভয়ে ভয়ে সোলায়মানের দিকে ফিরলো।

সোলায়মান হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলো, পুলিশের হাতে ধরা খেলেন কিভাবে? চুরি করেছেন? নাকি ইভটিজিং করেছেন?

জাফর মাস্টার উত্তরে কিছুই বললো না। শুধু অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। কিছুখন পর ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললো, আমাকে বাচান সোলায়মান ভাই, আমাকে বাচান। সোলায়মান হাসতে হাসতে হাসতে উধাও হয়ে গেলো।

পুলিশ দুইটি এবার ঘুরে তাকালো, সোলায়মান তোর বসের নাম? অই শালা বল, তোর কয়টা বস আছে। সোলায়মান কোথায় আছে বল হারামজাদা। জাফর মাস্টার চুপ করে থাকলো। সামনে থেকে এক পুলিশ দুই পুলিশকে ধমক দিয়ে বললো, চুপ করেন আপনারা, ওসি সাহেব ডলা দিবে এইডারে। ডলা খেলেই সব হরহর করে বলে দিবে। জাফর মাস্টারের মুখ দিয়ে কোন শব্দ না বের হলেও চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এলো।

জাফর মাস্টার মনে মনে কাঁদছে আর ভাবছে, এ কেমন বিপদে পরলাম। ভুত হয়েও কি জেল খাটতে হবে? এ কেমন ভুত হলাম আমি। কিভাবে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, সেই সুত্র কি কেউ আবিস্কার করেছে?

জাফর মাস্টার হাজতের ভিতর এক কোনায় বসে আছে। আরেক কোনায় তার মতোই ভয়ঙ্কর একজন বসে আছে। তাহলে সেও কি জাফর মাস্টারের মতো ভুত? জাফর সাহেব মনে মনে সাহস পেলেন, যাক একটা সঙ্গী পাওয়া গেলো। কাছে গিয়ে বললো, ভাই আপনি কবে মরেছেন?

লোকটি ক্ষেপে উঠলো, মরেছি মানে? আমার লগে ফাইজলামি করস? আমারে চিনস? থাবরায়া গাল ফাডায় দিমু, হুমুন্দির পুলা।

জাফর সাহেব ঘাবরে গেলেন, লোকটা তাহলে ভুত না। হাতজোর করে মাফ চাওয়ার ভঙ্গি করে জাফর সাহেব বললেন, সর‍্যি ভাই ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দেন। মাথাটা আউলা আউলা লাগছে তাই কি বলতে কি বলে ফেলেছি। ভুল হয়ে গেছে ভাই। আপনার নামটা যেনো কি ভাই?

লোকটি বাম হাতটা মুখের সামনে এনে বললো, আমার নাম জগলু। আমি খুনের আসামী। আমার মাথা খারাপ, যখন-তখন খুন করে ফেলি।

জাফর মাস্টার ভয় পেয়ে কোনার ফিরে গেলেন। কোনায় গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন তাকে ডলা দিতে নিয়ে যাবে। ডলা দিয়ে নিশ্চয় ছেড়ে দিবে, তারপর দূরে কোথাও গিয়ে ভূতদের স্কুল দিবেন, নাহলে ভূত সমাজের লেখক হয়ে যাবেন।

জাফর মাস্টার তার নিজের এই অবস্থা মেনে নিয়েছেন। মানুষ মরে গেলে তো আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। শুধু শুধু কান্নাকাটি করে কি লাভ। এর থেকে ভালো ভূতদের সাথে মিশে যাওয়া। ভূতদের সমাজে ভালো ভুত নিশ্চয় আছে, তারা তাকে নিশ্চয় সাহায্য করবে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুম কাতুরে জাফর মাস্টার ঘুমিয়ে গেলো।

ঘুম ভেঙ্গে জাফর মাস্টার দেখেন যে তিনি একটা চেয়ারে বসে আছেন, তার মাথার উপর হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলছে। জাফর মাস্টার বুঝে ফেললেন যে, তাকে ডলা দিতে নিয়ে আসা হয়েছে। জাফর মাস্টারের সব সাহস উড়ে গেলো। বুকের ভিতর হৃদপিণ্ড নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে।

ইয়া লম্বা গোফ নিয়ে একদিন বিশাল দেহী পুলিশ অফিসার হাজির হলেন। ইনিই নিশ্চয় ওসি, কারন তার পিছনে সেই দুই পুলিশ দাঁড়িয়ে মিটমিট করে হাসছে। মানুষ জাতি বড় রহস্যময়। একজন ব্যাথা পেলে আশেপাশের সবাই আহ-উহ শুরু করে দেয়, আবার সেই মানুষগুলিই পকেটমারকে মনের সুখে পেটায়।

ওসি সাহেব জাফর মাস্টারের ঠিক সামনের চেয়ারে বসে জাফর মাস্টারের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে পাক্কা পাঁচ মিনিট তাকিয়ে থাকলেন। তারপর একসাথে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন, কতদিন ধরে শিশু পাচারের ব্যবসায় আছিস? তোদের দলে কয়জন আছে? তোর বসের নাম কি?

জাফর মাস্টারের দুই চোখ দিয়ে পানি পরছে। কাদতে কাদতে বললেন, আমি কিছু জানি না স্যার। বিশ্বাস করুন, আমি কিছু জানি না। আমি বাচ্চাগুলোকে একটু ভয় দেখাতে গিয়েছিলাম শুধু। আমি শিশু পাচার করি না। বিশ্বাস করেন স্যার।

ওসি সাহেবের মুখে শয়তানি একটা হাসি দেখা গেলো। সেই দুই পুলিশ কে ডেকে বললো, বাবুমশাইরে ডিম খাওয়াতে হবে। ডিম ছাড়া মুখ খুলবে না। ডিমের ব্যবস্থা করো। বলেই তিনজনে হেসে উঠলো।

ব্যথায় যন্ত্রনায় জাফর মাস্টার নড়াচড়া করতে পারছেন না। তিনি একটা অন্ধকার ঘরের ঠিক মাঝখানে শুয়ে আছেন। কে যেনো তাকে ডাকছে। অনেক কষ্টে চোখ খুলে দেখেন, সোলায়মান ভয়ঙ্কর রুপ নিয়ে তার সামনে দাড়িয়ে আছে। জাফর মাস্টার সহ্য করতে না পেরে অন্যদিকে চোখ ঘুরে নিলো, সেদিকেও সোলায়মান দাঁড়িয়ে আছে। যেদিকে তাকায় সেদিকেই সোলায়মান। জাফর সাহেব চিৎকার করে উঠলেন। জাফর মাস্টারকে ঘিরে হাজার হাজার সোলায়মান ঘুরছে আর হাসছে। আকাশ পাতাল কাপিয়ে সোলায়মানরা হাসছে।

ধীরে ধীরে চারিদিকের দেয়াল অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, হাসির আওয়াজও কমে আসছে। দেয়াল সরে গিয়ে সেখানে ফাকা মাঠ চলে আসলো। চারিদিকে শুন্যতা, শুধুই শুন্যতা। জাফর মাস্টার উঠে দাড়ালো। দিকভ্রান্তের মতো হাটা শুরু করলো। অনন্ত সময় ধরে হাটছে জাফর মাস্টার। এই শুন্যতার কোন শেষ নেই। জাফর মাস্টার ক্লান্ত হয়ে বসে পরে, বিশ্রাম নিয়ে আবার হাটে। জাফর মাস্টারের আর কান্না পায় না। হাটে আর বিড়বিড় করে বলে, ভূতের বাচ্চাদের নিয়ে আর বই লিখবো না, কখনোই লিখবো না।