গল্পঃ আলাদীনের একদিন – ১ম খন্ড

আলাদীন দোতালার বারান্দায় বসে আছে। তার কিছুই ভালো লাগছে না। সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে থাকতে কারই বা ভালো লাগে। গত বছর শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আর কোথাও যাওয়া হয়নি। কাজ-কর্ম থাকলে তাও না হয় সময় কেটে যেতো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার কোন কাজ করতে হয় না, যখন যা দরকার চেরাগের দৈত্যকে বললেই এনে দেয়। দৈত্যর সাথে চুক্তি ছিল সে তিনটা ইচ্ছে পূরণ করে চলে যাবে, কিন্তু দৈত্য কয়েকশ ইচ্ছে পূরণ করার পরেও যাচ্ছে না। তার নাকি আলাদীনকে ছেড়ে ভালো লাগবে না, এখানেই সে নাকি সুখে আছে। একদিক দিয়ে সে খারাপ বলেনি, তার পরের প্রভু আলাদীনের মত ভালো নাও হতে পারে। একদিন আলাদীন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিল সে কোন পাহাড়ে চলে যায় না কেন। কিন্তু ইচ্ছে পূরণ দৈত্যরা নাকি বেশীদিন মানুষের সংস্পর্শ ছাড়া বাঁচতে পারে না। তাই আর কি করা, আলাদীনও চলে যাওয়ার ব্যপারে দৈত্যকে আর কিছু বলেনি। আর যাই হোক, অনেক উপকার করেছে সে আলাদীনের।

এসব ভাবতে ভাবতে আলাদীন কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝেও নি। ঘুম ভাঙল স্ত্রী জেসমিনের ডাকে, “কি হল আর কতখন ঘুমাবে?”

আলাদীন চোখ মেলে তাকালও, “অহ, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি?”।

জেসমিন হেসে ফেললো, “না ঘুমাচ্ছিলে না, নাক ডাকছিলে”।

আলাদীন আগে কখনো নাক ডাকতো না, এখন চোখ বন্ধ হওয়ার সাথে নাক ডাকা শুরু করে। এভাবে অলস বসে থাকলে কত রকমের অসুখই তো দেখা দেয়। নাক ডাকা অসুখের মধ্যে পরে নাকি এটা নিয়ে অনেক ভেবেছে আলাদীন। একদিন দৈত্যকে জিজ্ঞাসাও করেছিলো এই ব্যপারে, দৈত্য বলেছে এটা নাকি সুস্থতার লক্ষন।

“কি হল, আবার কোথায় হারিয়ে গেলে?”

“না কিছু না, কয়টা বাজে?”

“এখন বাজে রাত ১টা।”

“কি বল পাগলের মতো? বাইরে ঠা ঠা রোদ, আর এখন কিনা রাত ১টা। ঘড়ি নষ্ট হতে পারে, তাই বলে কি জ্ঞান-বুদ্ধিও নেই তোমার?”

“আচ্ছা আমার বুদ্ধি হাটুর নিচে, এবার এসো হাতমুখ ধুয়ে খেতে এসো।”

আলাদীন আর চোখে একবার জেসমিনের দিকে তাকিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেল। মেয়েটার বুদ্ধি-সুদ্ধি কখনোই হবে না, দুপুর বেলা বলে নাকি রাত ১টা বাজে। এতো বোকা মানুষ হয় এই যুগে।

জেসমিন কিন্তু আসলে এতো বোকা না, এখন আসলেই রাত ১১টা বাজে। বাইরের রোদ দৈত্যর কারসাজি। তার মাথায় কেমন করে জানি ঢুকেছে যে, তার প্রভুর রোদ দেখতে অনেক ভালো লাগে। তাই এখন বেশীরভাগ সময়ই তাদের বাড়িতে কৃত্রিম রোদ তৈরি করে রাখে। আলাদীনের চোখে একদিনও এই অস্বাভাবিকতা চোখে পরে নি। আসলে আলাদীনই আসল বোকা। এগুলি ভাবতে ভাবতে জেসমিন হেসে ফেললো।

“কি ব্যপার, হাসছ কেন?”

জেসমিন আরও জোরে হাসতে হাসতে বলল, কিছু না এমনিই।

আলাদীনও আর কিছু বললও না। চুপচাপ খেতে লাগলো। খেতে খেতেই একটা চিন্তা মাথায় এলো। কোথাও থেকে ঘুরে আসলে কেমন হয়। অনেকদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। জেসমিনকে বলতেই জেসমিন এক কথায় রাজি হয়ে গেল। রাজি হওয়ার দুইটা কারন আছে। এক, জেসমিন কখনো আলাদীনের কথার বিপক্ষে যায় না। আর দুই, জেসমিনের ঘুরতে খুব ভালো লাগে।

পরদিন সকালে আলাদীন দৈত্যকে ডাকল। দৈত্য কুর্নিস করে হাই তুলতে তুলতে হাত জোড় করে সামনে দাঁড়ালো।

“গুড মর্নিং প্রভু।”

“তুমি ইংলিশ শিখলে কোথা থেকে?”

“একবার আমেরিকায় গিয়েছিলাম ডিজনি স্টুডিয়ো দেখতে, তারা নাকি আমাকে আর আপনাকে নিয়ে ছবি বানিয়েছে। তখন শিখেছি।”

“সত্যিই ছবি বানিয়েছে নাকি? আমরাতো তাহলে সেলিব্রেটি হয়ে গেলাম। আচ্ছা যাই হোক, আমি কোথাও ঘুরতে যেতে চাই। কোথায় যাওয়া যায় বল তো?”

দৈত্য অনেকদিন পর নিজের মনের মতো কাজ পেয়ে খুশি হয়ে উঠলো, “বাহ দারুণ প্রস্তাব, চলুন বালি থেকে ঘুরে আসি।”

“নাহ, ওখানে অনেকবার গিয়েছি। নতুন কোন যায়গায় যেতে চাই।”

দৈত্য মাথা চুলকাতে শুরু করলো, “তা কি করে হয় প্রভু। আপনাকে তো সারা পৃথিবীই ঘুরিয়েছি, এমনকি সৌরজগতের সবগুলো গ্রহও ঘোরা শেষ। নতুন যায়গা কোথায় পাই?”

“না, পৃথিবীতেই এমন কোন যায়গা নিশ্চয় আছে যেখানে আমার যাওয়া হয়নি। আমার মন বলছে, আসলেই এমন কোন দেশ আছে যেখানে আমি যাইনি।”

দৈত্যর গালটাও কেন জানি চুলকাতে শুরু করলো, “কি জানি, আমার মন বলছে সব যায়গা ই ঘুরেছি। অন্তত আমি ঘুরেছি, সাথে আপনি ছিলেন নাকি মনে করতে পারছি না।”

আলাদীন চিন্তায় পরে গেল। তার পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না এমন একটা সমস্যায় পরলও। একটা দেশের নাম মনে করতে চেয়েও পারছে না। হঠাত তার মনে পরে গেল। দৈত্যর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

“হ্যা মনে পড়েছে। গতবার শ্বশুরবাড়ি থেকে আসার সময় দক্ষিন এশিয়ার কোন দেশে জানি নেমেছিলাম?”

দৈত্যর মাথার উপর কেউ যেন গরম তেল ঢেলে দিয়েছে এরকমভাবে লাফিয়ে উঠলো, “না না না, সেখানে যেতে চাইলেও আমি আপনাকে সেখানে নিয়ে যাবো না। আর তাছাড়া ইন্ডিয়াও আপনি একবার দেখেছেন”

ইন্ডিয়ার প্রতি দৈত্যের একটা খারাপ মনোভাব আছে। গতবার সেখানে যেয়ে তার একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। অবশ্য তারও কিছুটা দোষ ছিল।

দৈত্যের ভিত মুখ দেখে অনেকদিন পর প্রান খুলে হাসল আলাদীন। হাসতে হাসতে বললও, “না ইন্ডিয়ায় না তার পাশেই যে একটা ছোট-খাটো দেশ আছে সেটা। কি যেন নাম ওইটার?”

দৈত্যের দেহে প্রান ফিরে এলো এতক্ষণে। যাক বাবা বড় বাঁচা গেছে। আলাদীন বললে তাকে নিয়ে যেতেই হত। হাসিমুখে বললও, “ওহ, অইটা বাংলাদেশ। প্রায় ১৫০ বছর আগে গিয়েছিলাম একবার, অনেক সুন্দর দেশ।”

“হ্যা, আমারও তাই মনে হয়। উপর দিয়ে উড়ে আশার সময় তো দেখে ভালই লাগলো।”

পোষ্টটি ভালো লাগলে, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ