পৃথিবীর সব মা ই সেরা। সবার মায়ের মতো আমার মা ও আমার চোখে সেরা মা। মায়েরা জন্মদান থেকে শুরু করে লালন-পালন এবং বড় করে তুলতে যেই পরিমান ত্যাগ স্বীকার করে তা পরিমাপ করার মতো কোন ইউনিট আবিস্কার হয় নি। আসলে মায়ের ত্যাগ পরিমাপ করার দরকারও পরে না, কারন আমাদের সেটার জন্য কোন বিনিময় দিতে হয় না। আমরা সিমপ্লি সেটা ভুলে যেতে পারি। আর সবচেয়ে মজার কথা হলো মায়েরা সেগুলি সন্তানদের মনেও করিয়ে দেয় না। মা ছাড়া কারো লাইফে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কারো কাছে পাওয়া সম্ভব না।

আমার মা শুধু আমাকে ভালোবাসাই দেয় নি, আমার ক্যারিয়ার গঠনের পিছনেও একজন গুরুত্বপুর্ন মানুষ সে। অনেকেই ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে সাকসেসফুল হওয়ার পর অনেককে ধন্যবাদ জানায়। আমার ফ্রিল্যান্স ক্যরিয়ারে যদি কাউকে ধন্যবাদ জানাতে হয়, সেটা আমার মা কে জানাতে হবে।

আমার মা আমাকে প্রোগ্রামিং শেখায় নি, ফ্রিল্যান্সিং এর রাস্তা-ঘাটও দেখায় নি। কিন্তু এগুলি শিখতে-জানতে যেই সাপোর্টের দরকার ছিলো, সেটা দিয়েছেন। যেই সাপোর্ট না পেলে আমি আজকে এই পর্যায়ে আসার কথা চিন্তাও করতে পারতাম না।

আমি টুকটাক কোডিং শুরু করি কম্পিউটার কেনার আগে। লাইব্রেরি থেকে বই এনে খাতায় সি প্রোগ্রাম লেখতাম, আর সাইবার ক্যাফেতে সেগুলি রান করে দেখতাম। বুঝাই যাচ্ছে আমার কোন কম্পিউটার ছিলো না। আর কম্পিউটার কেনাও সম্ভব ছিলো না। আমার বাবা সেই সময়ে যতো ইনকাম করতেন তা দিয়ে সংসারই চলতো না। কম্পিউটার কেনার চিন্তা মাথায় আনাও তখন অপরাধের মতো। এরকম সিচুয়েশনে শুধু আমি একা ছিলাম না, সফল ফ্রিল্যান্সদের সবার অতীত নিয়ে যদি ঘাটাঘাটি করেন কেউ, এরকম অনেক বের হবে।

মানবিক শাখার স্টুডেন্ট হয়েও কম্পিউটারের প্রতি প্রচন্ড রকমের ভালোলাগা ছিলো আমার। আমি শুধু চেষ্টা করছিলাম কম্পিউটার থেকে আর্নিং এর একটা রাস্তা বের করতে। ততদিনে ফ্রিল্যান্সিং, ব্লগিং-এডসেন্স শিখে ফেলেছি। ভাঙ্গা-ভাঙ্গা ইংরেজি দিয়ে ব্লগও (ফ্রি) দাড় করে ফেলেছিলাম। ব্লগে মোটামুটি ভালো ট্রাফিক আসতো। তখন ভাবলাম এবার তাহলে কম্পিউটার কেনা যায় একটা। কিন্তু সমস্যা হলো কম্পিউটার কেনার টাকা পাবো কোথায়? আমার পরিবারের তখনকার অর্থনৈতিক অবস্থায় সেটা "আ বিগ কোয়েশ্চেন" না বলে "আ ইম্পসিবল কোয়েশ্চেন" বলতে হবে।

কিন্তু আমার মা বিলিভড ইন মি। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে আমার এক ফুফাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ধার করে নিয়ে আসে। যেটা আল্লাহর রহমতে বছরখানেক পরেই আমি শোধ করে দিয়েছি। বাট আমার মা যদি সেই ধার করে কম্পিউটারটা না কিনে দিতো, তাহলে আমি আজ এখানে থাকতাম না। কারন আমার মতো একটা পিচ্চির পক্ষে ধার করে কম্পিউটার কেনাটা সম্ভব না। আর সাইবার ক্যাফেতে একঘন্টা কম্পিউটার চালিয়ে অনলাইনে কাজ সম্ভব না। আর ব্লগিং তো সম্ভবই না। (পরে অবশ্য ব্লগিং বাদ দিয়ে ওয়েব ডেভেলপমেনটে মনোযোগ দিয়েছি। আমার ব্লগার থেকে ওয়েব ডেভেলপার হয়ে ওঠার পিছনে আরেকটা মজার কাহিনী আছে, আরেকদিন সেটা শেয়ার করবো।)

কম্পিউটার কিনে দিয়েই যে আমার আম্মুর এক্টিভিটিস শেষ তা কিন্তু না। দেড়-দুই হাজার টাকা বেতন পেয়ে সেই টাকা থেকে প্রতিমাসে আমাকে ৮০০ টাকা করে দিতেন ইন্টারনেট কেনার জন্য। ইন্টারনেট কেনা নিয়ে আলাদা একটা ব্লগ লিখেছি, চাইলে পড়ে নিতে পারেন।

আমার মা এবং আজকের আমি হয়ে ওঠার পেছনের ৮০০ টাকা
২০১৭ সাল, আজকে আমি নিজেকে সফল বলে দাবি করতে পারি। মহান আল্লাহ্‌র রহমতে সকল অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। নিজের ও পরিবারের যেকোনো ইচ্ছা সাথে সাথে পূরণ করতে পারি। কিন্তু এমনটা নাও হতে পারতো, যদি আমার মা ৫-৬ বছর আগে মাসে ৮০০ টাকা না দিত। ৬-৭ বছর আগে যখন প্রবল আগ্রহ নিয়ে কাজ শেখা শুরু ক…

যেহেতু তখনো ইঙ্কাম শুরু হয় নি, সো আমার ভবিষ্যৎ ছিলো পড়াশোনা শেষ করে চাকরি-বাকরি করে সংসারের হাল ধরা। কম্পিউটার থেকে ইনকাম করা যাবে এমন কথা আমার মা ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করতো না, ইভেন আমার বাবাও বিশ্বাস করতো না। বিশ্বাস না করারই কথা, তারা তাদের লাইফ-টাইমে কাউকে দেখেনি যে কেউ ঘরে বসে কম্পিউটারে কাজ করে ইনকাম করেছে। কিন্তু আমার সহজ-সরল আম্মু আমার কথা বিশ্বাস করেছে। কম্পিউটার রিলেটেড কথা-বার্তা না বুঝলেও মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। পড়াশোনার দিকে কম গুরুত্ব দিয়ে দিনরাত কম্পিউটারের পিছনে পরে থাকার মতো বাজি ধরতে সাহস দিয়েছে। এজন্য আম্মুকে যথেষ্ট কথা শুনতে হয়েছে অনেকের কাছে। বাট আমাকে আমার মা ভেঙ্গে পরতে দেন নি।

আমার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গঠনের অনুপ্রেরনা ছিলো আমার মা। তার কষ্টকে সফল করতেই আমাকে ফ্রিল্যান্সিং এ সফল হতে হয়েছে।  আমার মায়ের অনুপ্রেরনাই আমাকে প্রতিদিন কমদামি সিআরটি মনিটরের সামনে ১৫-১৬ ঘন্টা টানা বসে থাকার মতো ইচ্ছা-শক্তির যোগান দিয়েছে। তখন যদি আমাকে কেউ আমার লাইফের মোটো জিজ্ঞেস করতো, আমি এক কথায় বলে দিতাম আমার মায়ের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে টিউশনি করা বন্ধ করা। আর এখন যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে আমার জীবনের সফলতা কি, আমি বলবো, আমি আমার মাকে সুখি করতে পেরেছি।

আজকে বিশ্ব মা দিবস, হঠাত করে পুরোনো দিনের কথাগুলি মনে পরে গেলো। মায়ের গুনগান আসলে এক বসায় শেষ করা সম্ভব না।  আমার লাইফের মতো সবার লাইফেই মায়ের একটা না একটা বিগ স্টেপ থাকেই। খুজে দেখেন পেয়ে যাবেন আপনার সহজ-সরল বোকা মা তা আপনার লাইফে কি একটা চেঞ্জ এনে দিয়েছে।

সবাই মা কে ভালোবাসবেন। আপনি হয়তো টের পান না, কিন্তু মায়েরা প্রতিটা মিনিটে আপনার কথা মনে করে। আপনি এটলিস্ট দিনে একবার মায়ের কথা মনে করুন, মা কে ভালোবাসুন। মায়ের কাছে গিয়ে একটু বসুন, আদর করে মা কে ডাকুন। মা তো খুশী হবেই, আপনিও পজিটিভ এনার্জি পাবেন। মা কে ভালোবাসুন সারাবছর।

আজকে এখানেই শেষ। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা।