কয়েকবছর আগের ঘটনা, তখন আমি “অবুঝ বাঙালি” নামে ফেসবুক এ ঘুরাফেরা করতাম। অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি আমার এই নামটা থাকার সময়। এখন যেঁ পাইনা, তা নয়। আসলে, ফেসবুক কমিউনিটিতে আমি পরিচিতি লাভ করেছিলাম ওই নামটি দিয়েই। অনেকেই দেখা গেছে নতুন পরিচয় হয়েছে, ফেসবুক আইডি চাইলো। আইডি দেয়াড় পরে বলে, আরে আপনাকে তো আমি চিনি। এরকম ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে, অনেক ভালো লাগতো তখন।

যাই হোক, ঘটনায় ফিরে আসি। আমি আগে “ব্লগিং স্কু ল ” নামে একটা ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনা করতাম। সেখানেই পরিচয় ছোটভাই সিফাতের সাথে। অনেক ভালো লাগতো অনেক ছোট একজন মানুষও কিভাবে নিজেকে বিকশিত করতে পারে, আমি ওকে দেখে বুঝেছি। আমি মনে মনে ওকে প্রডিজি বলতাম।

যাই হোক, একদিন রকমারি.কম থেকে ২ টা বইয়ের অর্ডার দিয়েছিলাম। ডেলিভারি পাওয়ার পর একটা শর্ট রিভিউ দেই ফেসবুকে ওদের সার্ভিস নিয়ে নিয়ে। ওই স্ট্যাটাসে সিফাত কি কিনেছি জানতে চেয়ে কমেন্ট করে। আমিও মজা করে লিখেছিলাম যেঁ, ক্যান্সারের মেডিসিন কিনেছি। আমার এই কমেন্টাই ছিল আমার আজকের পোষ্টটি লেখার ইনভেস্টেমেন্ট।

আমার জানা ছিল না যে, সিফাত সেই মজাটা ধরতে পারে নি। আড় রকমারিতে যে, ওষুধ-পত্র বিক্রি করে না তাও বোধয় ও তখন জানতো না।

এই কমেন্টের ঘটনাকে যদি ২ ধরে নিই, তাহলে দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাবার জন্য আরেকটি ২ অবশিষ্ট আছে। দ্বিতীয় ২:

কমেন্টের ঘটনার কিছুদিন পরেই আমার পাসপোর্ট এর প্রয়োজন পরল, যেহেতু ন্যাশনাল আইডি তখনো হয়নি তাই বিকল্প হিসেবে পাসপোর্ট তৈরি করেছিলাম। আড় যথারীতি ফেসবুকেও পোষ্ট দিয়েছিলাম।

আড় এই ২ টাকেও সিফাত আগের ২ এর সাথে যোগ করে চার বানিয়ে ফেললো। ওর মনের কথা যখন জানতে পারলাম, তখন আমি অনেকক্ষণ হেসেছিলাম। অবশ্য, আরও ২ অবশিষ্ট আছে। তখন মাঝে মাঝেই মন খারাপ থাকতো, আড় মন খারাপ স্ট্যাটাস দিতাম। তখন সিফাত আমাকে অনেকভাবেই সমবেদনা জানাত। আমারও কেনও জানি, ব্যাপারটা মেনে নিতেই ভালো লাগছিল। হয়তোবা, সেই অকৃত্রিম সমবেদনাটা পাওয়ার লোভেই।

এই হল আমার ক্যান্সারের পিছনের ঘটনা। এখানে আমারও একটু প্রশ্রয় ছিল, আমিও ওর ভুল ধারনাটিকে শুধরে দিইনি। আজ বলবো/কাল বলবো করে করে ব্যপারটি ভুলেই গিয়েছিলাম।

অনেকদিন পর, হঠাত একদিন তামিম ভাইয়ের মেসেজ। তামিম না বলে তারছিরা তামিম বললেই বেশিরভাগ মানুষ চিনবেন। ফেসবুকে, একটা পরিচিত নাম। একসময় ফ্রেন্ডলিস্টের সবার নিউজফিড ভরিয়ে রাখতেন, এর তামিম ভাই। কিন্তু কেউই বিরক্ত হতেন না বলেই আমার বিশ্বাস। অনেক মজার একটা মানুষ। যাই হোক, উনার মেসেজ পেয়ে আমার ক্যান্সারের ব্যাপারটা মনে পড়লো। অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, উনার কানেও পৌঁছে গেছে ঘটনাটা।

আমিও তামিম ভাইয়ের সাথে মজা করছিলাম। তবে সরাসরি কিছুই বলিনি (সুতরাং মিথ্যা কথা বলা হোয় নি) । উনার সাথে হওয়া কনভারসেশন টি আমি প্রকাশ করে দিয়েছিলাম অনেক আগেই।

এর পরে আরও কয়েকজনের মেসেজ পেয়েছি, সবার নাম আমার মনে নেই তবে তখন আমার মনে হচ্ছিলো আমার সত্যি সত্যি ক্যান্সার হওয়াটাই বোধয় ভালো ছিল। এতোগুলি, মানুষের সাথে একটা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে মজা করা হয়ে গেছে। যদিও, আমি জানতাম না যে ঘটনা এতদূর গড়াবে।

সেদিন বুঝেছিলাম, যদি সত্যি সত্যিই মরে যাই তাহলে অন্তত কয়েকজন হলেও আমাকে মনে করবে। আমি সিফাত ও তামিম ভাইয়ের কাছে অফিসিয়াল ক্ষমা চাচ্ছি আর অন্যদের কাছেও। আর আপনাদের সারা জীবন মনে রাখবো ভাই। আপনাদের দিয়েই বুঝেছি, কিভাবে বাস্তবে না দেখে বা পরিচিত না হয়েও একজনকে ভালোবাসা যায়। মুরুব্বিরা টিটকারি মেরে বলে, এখনকার প্রজন্ম হল ফেসবুক প্রজন্ম। ফেসবুক প্রজন্ম হয়ে যদি এরকম ভালোবাসা পাওয়া যায়, তাহলে আমার সেই টিটকারিগুলি সহ্য করে নিতে আপত্তি নেই।