হায়দার রশিদ ছুটে চলেছে স্কন্ধে প্রকাণ্ড ব্যাগ নিয়ে। কয়েক দিনের অবসর পেয়ে ঘুরতে যাবে রাজস্থান। ফেলুদার গোয়েন্দা মুভিতে জয়সালমীরের কেল্লাগুলো দেখে তারও ইচ্ছা জাগছে রাজস্থান ঘুরে দেখার। রাজস্থানের প্রকৃতি একটু বেশিই সুন্দর। তার উপর প্রিয় গুরু ফেলুদার পাদচারণা পরেছে বলে কথা। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে গিয়ে পৌঁছল। আর আধা ঘণ্টা পরেই ফ্লাইট। কাল বিলম্ব না করে ইমিগ্রেশন থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিমানে গিয়ে বসল সে। জেট এয়ারওয়েজের ডিরেক্ট ফ্লাইট তাকে নামিয়ে দিবে দিল্লী। দিল্লী থেকে জিপে রাজস্থান। বিমানের অর্ধেক যাত্রী ততক্ষণে এসে গেছে। হায়দারের সিট পরেছে মাঝের সারিতে। পাশের সিটে বসে আছে এক তরুণী। বয়স কত হবে আন্দাজ করা মুশকিল। পাশের সিটে মেয়ে পরেছে দেখে সে মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হল।

নির্ধারিত সময়েই বিমান টেক অফ করল। আড়াই ঘণ্টা লাগবে দিল্লী পৌছতে। বিমান তার স্বভাব সুলভ গতি তুলে আকাশ ভেদ করে এগিয়ে চলছে। যাত্রার ১৫ মিনিটও হয় নি হায়দারের আশে পাশের লোকগুলো বিরক্তিকর গল্প জুড়ে দিছে। এরা বিমানের মত অভিজাত যানবাহনকেও ঢাকার লোকাল বাসের মত আড্ডাখানা বানিয়ে ফেলছে। স্বভাব যায় না মরলেও। তাতে রীতিমত বিরক্ত হায়দারের পাশের সিটের যাত্রীও। গল্পবাজরা তাদের গল্পের মাঝে হায়দারকেও টানতে চাইল। হায়দারকে লক্ষ্য করে কিছু বলল। কিন্তু হায়দার কিছু না বলে একমনে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন ওদেরকে দেখতেই পাচ্ছে না। ব্যাপারটা লক্ষ্য করল তার পাশের সিটের তরুণী। হায়দারকে একজন কয়েকটা প্রশ্ন করেছিল।

কিন্তু কোন উত্তর দেয় নি। এখনও আরেকজন প্রশ্ন করেই চলছে। তাতেও নিরুত্তাপ হায়দার। মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েটা ভাবল ছেলেটা হয়ত বোবা। সে জানে কিভাবে বোবাদের সাথে কথা বলতে হয়। চট করে স্মার্টফোনটা বের করে লিখে দিল আপনি কী বোবা? তারপর সেটা হায়দারের সামনে নিয়ে ধরল। হাসি ফুটে উঠল হায়দারের মুখে। বলল না আমি বোবা নই বধির। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার অবস্থা বুঝতে পারছেন বলে। ঐ ফাউল লোকগুলা না বুঝে চেঁচিয়েই যাচ্ছে। আমি কানের সমস্যার কারণে মেয়েদের এড়িয়ে চলি। কিন্তু আপনার ব্যবহার খুব ভাল লেগেছে। অবশ্য আমি লিপ রিডিংও ভাল পারি। কিন্তু ওদের কথা শুনার মত মন মানসিকতা নাই। তাই এদের মুখের দিকে খেয়াল করি নি।

এবার মেয়েটা সবাইকে এক প্রকার ধমকের সুরেই বলল মানুষের কিছু আচরণ দ্বারা তার অবস্থা বুঝে নেওয়া উচিত। এই লোকটার প্রথম কিছু আচরণ দ্বারাই আমি বুঝে গিয়েছিলাম আর যাই হউক সে অন্তত মানুষের কথা শুনতে পায় না। প্রথমে ভাবছিলাম হয়ত বোবা। কিন্তু এখন জানলাম তিনি কানে শুনতে পান না। যারা কানে শুনতে পায় না তাদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে সেটাও কী শিখিয়ে দিতে হবে? হু আপনাদের তো সেই জ্ঞানই নাই। উনার সাথে যদি কথাই বলতে চান তাহলে কোন কিছুতে লিখে উনাকে দেখাবেন। মেয়েটার ধমক খেয়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। যদিও হায়দার লিপ রিডিং করতে পারে তারপরও রাখি তার ঢাউস সাইজের মোবাইলে আবার লিখে দিল আমি ডা. রাখি ইসলাম। পেশায় ডেন্টিস্ট। আপনার নামটা বলবেন কী? সে বলল আমি হায়দার রশিদ। পেশায় প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।

নাম শুনে চমকে উঠল রাখি। বলল আপনিই কি সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা হায়দার রশিদ? বিনয়ের হাসি দিয়ে হায়দার বলল আজ্ঞে আমিই। তবে বিখ্যাত হতে পারলুম কই। আপনার চেম্বার কোথায় জানতে পারি? রাখি বলল ঢাকাতেই একটা ডেন্টাল সেন্টারে প্র্যাক্টিস করি। পড়াশুনা শেষ করেছি সবে দু বছর হল। হায়দার বলল তো দেশের বাড়ি কোথায় আপনার? ঢাকাতেই নাকি? রাখি মৃদু হেসে বলল আমার দেশের বাড়ি ভোলা জেলায়। তবে ইন্টারের পর থেকেই ঢাকাতে স্যাটল। আর আপনি? হায়দারও পাল্টা হেসে বলল আমার দেশের বাড়ি ফেনি। সেখানেই পড়াশুনা করা।

বর্তমান ঠিকানা বলা মুশকিল। এক প্রকার যাযাবর বলতে পারেন। তদন্তের কারণে এদিক সেদিক ঘুরতে হয়। ফ্রি সময়টা গ্রামের বাড়িতে কিংবা ট্যুর করে কাটিয়ে দেই। কারণ আমি প্রকৃতিকে ভালবাসি। রাখি বলল আপনি কিভাবে কেস নেন যদি বলতেন। আপনার কী অফিস বা চেম্বার আছে? হায়দার বলল গুলশানে একটা অফিস আছে। সেটাতে আমি ব্যবসায়ীক কাজই বেশি করি। সেখানেই ক্লায়েন্টরা আসে কেস নিয়ে। ভাল লাগলে কাজ নেই। তো এবার আপনি কোথায় যাচ্ছেন? রাখি বলল আমি যাচ্ছি শিমলা, মানালী। আপনি কী তদন্ত করতে যাচ্ছেন? হায়দার বলল না এমনিতে ঘুরতে রাজস্থান যাচ্ছি। জানেনই তো আমার কানের সমস্যা নিয়া কাজ করা কতটা কঠিন। তদন্ত করতে গেলে সব সময় আমার এসিস্টেন্ট থাকে সাথে। সে এখন ছুটিতে। আমিও এদিকে বেরিয়ে পরলাম। সবাই যদি আপনার মত আমাকে বুঝতে পারত তাহলে একাই কাজ করতে পারতাম। বিমান এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। আকাশ মেঘমুক্ত। নিচের সব কিছু দেখা যায়। নদীগুলাকে মনে হয় রশির মত। একটু পরেই দিল্লী ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টে নিরাপদেই ল্যান্ডিং করল বিমান।

প্লেন অবতরণ করেছে। সবাই যে যার মত চলে যাচ্ছে। হায়দারকে ইমিগ্রেশন পার হতে সাহায্য করল রাখি। অবশ্য তেমন প্রশ্নও করে নি। যা করেছে রাখিই হায়দারের হয়ে উত্তর দিয়েছে। তখন লাঞ্চের সময়। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জের ক্যান্টিনেই লাঞ্চ করতে বসল হায়দার-রাখি। লাঞ্চ করে দুইজন ২ দিকে চলে যাবে। খাবার আসার আগে ইন্টারনেটে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিলো হায়দার। হঠাৎ টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি হেডিং এ গিয়ে চোখ আটকে গেল তার “Business man killed in Delhi and historical diamond missing”. এক নিঃশ্বাসে পুরো খবরটা পড়ে ফেলল সে। ভদ্রলোক পার্কে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়। খবরটা পড়েই গোয়েন্দা মন নড়ে উঠে তার। সিদ্ধান্ত নিলো এইটার তদন্ত করবে। ডা. রাখিকে জানিয়ে দিল তার ইচ্ছার কথা।

রাখি বলল আমার সামনে এমন সুযোগ আসবে কল্পনাও করতে পারি নি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে তাহলে এই কেসে আপনার এসিস্টেন্ট হিসাবে কাজ করব। কাজটা করতে পারলে নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হবে। মৃদু হেসে হায়দার বলল এমন সহকারী পেয়ে আমিও ভাগ্যবান। আপনি না থাকলে এই কেসের তদন্ত করা দুরূহ হয়ে যেত। খাবার আসতে দুইজনেই গোগ্রাসে গিলে বেরিয়ে গেল। দিল্লী পুলিশ কমিশনার হায়দারের পরিচিত। এর আগে তার কলকাতার গোয়েন্দা বন্ধু অরুণাভ চক্রবর্তীর সাথে একসাথে দিল্লীতে একটা কেসের সমাধান করেছিল। সেখান থেকেই পুলিশ কমিশনার জগজিতের সাথে পরিচয়। রাখিকে দিয়ে পুলিশ কমিশনারকে ফোন করাল। রাখি হায়দারের নাম বলতেই চিনে ফেলল। জগজিৎকে হায়দারের ইচ্ছার কথা জানাল। শুনে পুলিশ অফিসার বলল সে তদন্ত করবে বেশ। তাকে আর কষ্ট করে ভিক্টিমের বাড়িতে যেতে হবে না। আমিই এয়ারপোর্টে পুলিশ পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারাই আপনাদেরকে ভিক্টিমের বাড়িতে নিয়ে যাবে।

১৫ মিনিটের মাঝেই নিকটস্থ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে একটা জিপ এসে থামল। জিপে আছেন দুইজন পুলিশ অফিসার। এসেই হাঁক ছাড়লেন হু ইজ মিস্টার হায়দার? এগিয়ে গেল রাখি। আমরাই। কোন কথা না বলে পুলিশের জিপে উঠে গেল হায়দার ও রাখি। দিল্লীর অলিগলি পেরিয়ে জিপ এসে থামল একটা বাড়ির সামনে। বাউন্ডারির দেওয়াল অত্যন্ত সুন্দর কারুকাজ করা। এলইডি লাইটের ফলকে জ্বলজ্বল করছে “নীড় মহল”। গেট পেরিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে পরল তারা। বাড়ির আভিজাত্য দেখেই বুঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক অনেক পয়সার মালিক ছিলেন। আজ সকালে প্রমোদ ভ্রমণে পার্কে গিয়েছিলেন। সেখানেই খুন হন। নিহত ব্যক্তির নাম জয়ন্ত চক্রবর্তী। দিল্লীতে বিরাট ব্যবসা। দিল্লীতে বাস করলেও তিনি বাঙালি। ভদ্রলোকের মৃত্যুতে বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পার্ক থেকেই পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে ময়না তদন্তের জন্য। লাশ আসবে আগামীকাল। সবাই গিয়ে বৈঠকখানায় বসল।

রাখির মাধ্যমে পুলিশ হায়দারকে বলল জয়ন্ত বাবু ছিলেন বিপত্নীক। বাড়িতে থাকত ড্রাইভার, চাকর, সিকিউরিটি গার্ড, আর জয়ন্ত বাবুর মা। সন্তান বলতে একজনই ছেলে। সে থাকে মুম্বাই। বাপের মৃত্যুতে এখন বাড়িতে আছে। বিশাল বাড়ি হলেও মানুষ থাকত অল্প কজনই। আপনি এদেরকে কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে করতে পারেন। এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। রাখি সব কিছু লিখে দেখাল হায়দারকে। হায়দার বলল বেশ জয়ন্ত বাবুর ছেলেকে ডাকুন। তার সাথে একটু কথা বলতে চাই। পুলিশ জয়ন্ত চক্রবর্তীর ছেলে রাকেশ চক্রবর্তীকে ডেকে আনল। হায়দার তার পাশে গিয়ে বসার অনুরোধ করল রাকেশকে। বলল আপনার বাবার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন। রাকেশ বলল বাবা নির্বিবাদী মানুষ ছিলেন। সবার সাথেই হাসিখুশি থাকতেন। যাকে যেভাবে পেরেছেন সাহায্য করেছেন। পুরানো জিনিষ সংগ্রহ করার বেশ শখ ছিল। তাই কোথায়ও ঐতিহাসিক জিনিষের নিলাম হলেই কিনে নিয়ে আসতেন। আর ছিল ঘুরাঘুরির শখ। সপ্তাহে ২/৩ দিন এদিক সেদিক ঘুরতেন।

হায়দার বলল বেশ। আপনার বাবা খুনের সাথে একটা মূল্যবান হীরাও নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। এই হীরাটা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? রাকেশ বলল হীরাটা ছিল দিল্লী সালতানাতে ব্যবহার্য সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির হীরা। যাদের কাছে এই হীরা ছিল তারা প্রায় বছর খানেক আগে অর্থ সংকট পরে নিলামে তুলে। বাবা খবর পেয়ে নিলাম থেকে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি রুপি দিয়ে কিনে নিয়ে আসে। অবশ্য নিলামে একজনের সাথে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল।

শেষতক বাবা ৫০ কোটি অফার করায় সে পিছু হটে। হায়দার বলল আচ্ছা খুনটা কিভাবে হয় বলতে পারবেন? রাকেশ বলে চলল বাবা সাত সকালেই উঠেন। প্রতি দিনের মত আজও সকালে উঠে ড্রাইভারকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে যান। এত সকালে পার্কে কেউ থাকে না। বাবাকে পার্কে নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার অন্য দিকে চলে যায়। বাবা বলেছিল ২০ মিনিট পরে আসতে। ২০ মিনিট পরে ড্রাইভার ফিরে দেখে বাবা পার্কে উপুড় হয়ে পরে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে আশে পাশ। সম্ভবত কেউ পিছন দিক থেকে গুলি করেছিল। ড্রাইভারই পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে আমিও বাড়ি আসি। তখন থেকেই হীরাটা পাওয়া যাচ্ছে না।

হায়দার বলল এই হীরাটা ছাড়া আর কোন মূল্যবান ঐতিহাসিক জিনিষ আছে আপনাদের বাড়িতে? বাড়িতে কখনও চুরি হয়েছে? রাকেশ বলল আগেই বলেছি বাবার ঐতিহাসিক জিনিষ জমানোর শখ। এই হীরাটার চেয়েও অনেক মূল্যবান বস্তু আছে আমাদের বাড়িতে। বাড়িতে কখনও চুরি হয় নি। লোকজন সব বিশ্বস্ত। অবশ্য চুরির সুযোগও নেই। সব জায়গাতেই সিসি ক্যামেরা ফিট করা। প্রতিবার বাড়িতে এন্ট্রি ও এক্সিটের সময় দেহ তল্লাশি করা হয়। হায়দার বলল গুড। আপনাদের কি কাউকে সন্দেহ? রাকেশ বলল বাবাকে খুন করতে পারে এমন লোক আমাদের বাড়িতে নাই। হায়দার বলল বেশ গাড়ির ড্রাইভার আর সিকিউরিটি গার্ডদের ডেকে আনতে পারবেন? ২ মিনিটের মাঝেই সবাইকে নিয়ে হাজির হলেন রাকেশ চক্রবর্তী। হায়দার ড্রাইভারকে দিয়েই শুরু করল।

- আপনার নাম কী?
- ভীষণ সিং বেদি।
- আপনি কখন জয়ন্ত বাবুকে নিয়ে বের হন পার্কে?
- বাবু ভোর ৫ টাতেই উঠে যায়। এরপর ব্রেকফাস্ট করে সোয়া ৫টার দিকে আমাকে নিয়া বের হয়। আমি পার্কে নামিয়ে দেওয়ার ২০ মিনিট পরে আসতে বলে।
- পার্কে নামিয়ে দিয়ে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
- সামান্য দুরেই একটা দোকানে বসে চা সিগারেট খাই। সেখানেই সময় কাটিয়ে আবার পার্কে ফিরে আসি বাবুকে ডাকতে। ফিরে দেখি বাবুর লাশ পরে আছে। এরপর আমি পুলিশকে খবর দেই।
- আপনি আশে পাশে কাউকে দেখেন নি?
- না। পার্কে তখন কেউ ছিল না। হায়দার এবার দুই সিকিউরিটি গার্ড নিতাই ও নিতিশ চোপড়াকে ডাকল।

-নিতিশ চোপড়া জয়ন্ত বাবু যখন বাসা থেকে বের হয়ে যায় তখন আপনি কী করছিলেন?
- প্রতিদিনের মতই গাড়ি বের হওয়ার জন্য গেট খুলে দেই।
- বাবু চলে যাওয়ার পর কী করেছেন?
- স্বাভাবিকভাবেই আমি গেটে ডিউটি করছিলাম। প্রায় ৪০ মিনিট পর দেখি ড্রাইভার ফিরে এসেছে গাড়ি নিয়ে। সাথে বাবু নাই। ড্রাইভার নেমেই খুন খুন বলে চিৎকার শুরু করল। তখন আমি সবাইকে নিয়ে পার্কে যাই।
- আপনি এখানে এসেছেন কতদিন ধরে?
- সে প্রায় ৯ মাস হবে। জয়ন্ত বাবু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিল সিকিউরিটি গার্ড চেয়ে। আমি সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে ইন্টারভিউ দিতে আসি। চাকরীটা হয়ে যায়। বলা যায় উনার উপরই আমার ফ্যামিলি টিকে আছে। এখন আমার কী যে হবে। বেশ ভেঙ্গে পরলেন নিতিশ চোপড়া।

হায়দার এবার নিতাইকে উদ্দেশ্য করে বলল আর আপনি কী করছিলেন? নিতাই বলল বাবু গেট পার হয়ে যেতেই আমার কেমন তন্দ্রা এসে যায়। চেয়ারেই চোখ বুঝে ঘুমাই কতক্ষণ। নিতিশের হাঁক ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। আমি এখানে আছি বছর পাঁচেকের উপর। হায়দার আর কাউকে জেরা করল না। সবাইকেই বিদায় করে দিল। ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে থেকে বেরিয়ে আসল তারা। পুলিশ হায়দারকে জিজ্ঞেস করল কোন ক্লু পেলেন? উত্তরে সে বলল তেমন কিছু না। জাস্ট সন্দেহ। আপনাদের কী মনে হয়? পুলিশ বলল আমাদের তো মনে হচ্ছে নরমাল চুরি ছিনতাই এর ঘটনা। এদিকটায় চুরি ডাকাতির ঘটনা একটু বেশিই হয়। হয়ত ছিনতাইকারীকে বাঁধা দিতে যাওয়াতে গুলি করেছে।

দিল্লীর একটা হোটেলে উঠেছে হায়দার ও রাখি। হায়দারের রুম নাম্বার ৫০২ আর রাখির ৪০৩। পুলিশ অবশ্য অনেক অনুরোধ করেছিল তাদের কোয়ার্টারে থাকতে। কিন্তু হায়দার রাজি হয় নি। খুনের জায়গাটায় একবার যাওয়ার জন্য মন আনচান করছে তার। সেখানে যদি কোন ক্লু পাওয়া যায়। যে ক্লু ধরে আগাচ্ছে সেটাতে সফল হওয়া যাবে কিনা তার নিজেরই সংশয়। কিন্তু এ ছাড়া রাস্তাও নাই। সে রাতেই পুলিশ কমিশনার জগজিৎকে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে মেইল করল। মেইলের রিপ্লাই এলো প্রায় ১ ঘণ্টা পরে। জানাল পুলিশ হায়দারকে হোটেল থেকেই তুলে নিবে সকালে। রাখির কাছে যাওয়া দরকার। মেয়েটার কাছে যতটা প্রত্যাশা করেছিল তারচেয়েও বেশি হেল্প পেয়েছে। ও না থাকলে জেরা করা সম্ভব হত না। ৪০৩ নাম্বার রুমের সামনে গিয়ে কলিং বেল চাপল সে। রাখি তখন ফ্রেশ হয়ে টিভি দেখছিল। কলিং বেল শুনেই দরজা খুলে দিল। হায়দার গিয়ে একদিকের সোফায় বসল। বলল ডাক্তার রাখি আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি যেভাবে সাহায্য করেছেন সেভাবে আমার এসিটেন্টও সাহায্য করতে পারে না। আপনাকে যদি আমার পার্মানেন্ট এসিস্টেন্ট বানাতে পারতাম ভালই হত।

শেষ কথাটার গভীরতা কতটুকু সেটা বুঝতে পারল না রাখি। সরল মনেই বলল এই ছাইপাঁশ কাজে যে আপনার মনে ধরবে ভাবি নি। তদন্ত কতটুকু আগাতে পারলেন? হায়দার বলল নাথিং। তেমন কোন ক্লু নাই। শেষ পর্যন্ত এটা চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনাই হতে পারে। রাখির মনে যেন কিছুটা হতাশা ধরে গেল। তবুও আপনি একটু চেষ্টা করে দেখবেন না? হায়দার বলল দেখুন গোয়েন্দারা এত সহজে হাল ছাড়ে না। সবে তো ১ দিন গেল। অপেক্ষায় থাকুন দেখি কী করতে পারি। আর কাল আপনি সকাল সকাল উঠে যাবেন। খুনের পার্কে একবার যেতে হবে। বলেই রাখিকে গুডনাইট জানিয়ে নিজের রুমে ফিরে আসল। রুমে অনেক্ষণ যাবত পুরানো বুকমার্ক করা পত্রিকার নিউজগুলো দেখতে লাগল। এটা হায়দারের পুরানো অভ্যাস। কোথায়ও কিছু ঘটলেই পত্রিকার কভারেজগুলো বুকমার্ক করে রাখে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এসব এখন সহজ কাজ। আগেকার দিনে অনেকে পত্রিকার কাটিং জমাত।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে গেল হায়দার আর রাখি। পুলিশের গাড়ি ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। গাড়িতে বসে আছেন স্বয়ং পুলিশ কমিশনার জগজিৎ। হায়দার হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য। রাখিকেও পরিচয় করিয়ে দিল। জগজিৎ বলল কালই আসতাম। আপনাকে দ্রুত সার্ভিস দিতে গিয়েই কাছের পুলিশ পাঠিয়ে দিয়েছি। জিপ থামল একটা পার্কের সামনে। বেশ সুন্দর পরিপাটি গোছানো পার্ক। পুলিশ পার্ক ঘিরে রেখেছে।

কাউকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। এই চমৎকার সুন্দর পার্কটিই এখন ভীতির চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পার্কের ভিতর ঢুকল হায়দার, জগজিৎ ও রাখি। একটা বেঞ্চের পাশে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। বুঝাই যাচ্ছে এখানেই জয়ন্ত বাবুকে খুন করা হয়। আর তিনি সামনে লুটিয়ে পরেন। হায়দার পুরো জায়গাটা মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করল। তেমন কোন আলামত পেল না। হঠাৎ তার নজর গেল পার্কের পিছনে। কিছু বাচ্চা ছেলে খেলনা ড্রোন উড়াচ্ছে। হায়দার বলল জগজিৎ বাবু আপনি এখানেই থাকেন। ডাক্তার রাখি আসুন তো আমার সাথে। পার্কের পিছনে বাচ্চাগুলোর সাথে কথা বলি।

দুইজনেই দ্রুত পায়ে বাচ্চাগুলোর কাছে গেল। হায়দার হাঁক ছাড়ল এই পিচ্ছি এইদিকে আসো। যাকে বলল তার বয়স ১০/১২ হবে। নাদুস নুদুস গড়ন। গাঁয়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। নাম কী তোমার?

-রৌদ্র প্রতাপ।
- তোমার কী প্রতিদিনই ড্রোন উড়াও?
- হ্যাঁ। আমরা ৪/৫ জন প্রতিদিনই সকালে ড্রোন উড়ায়া থাকি।
- কাল কী ড্রোন উড়াইছো?
- সকালে আমি একা উড়িয়েছি। অন্যরা আসার আগেই পুলিশ আমাদেরকে চলে যেতে বলেছে। - ড্রোনের মেমরি কার্ডটা আমাকে দিবে? যত দাম বল তাই দিব।
- না দিব না। এই মেমরি কার্ডে অনেক কিছু আছে।
- আমাকে কপি করে দিবে? আমার মোবাইলে কপি করে নিব।

বাচ্চাটা এবার আগ্রহের সাথেই মেমরি কার্ডটা খুলে দিল। হায়দার ওর মোবাইলে কার্ড লাগিয়ে সব ডাটা কপি করে আবার ফেরত দিয়ে দিল। ড্রোনের মেমরি কার্ড দিয়ে হায়দার কী করবে তা অবশ্য রাখির মাথায় ধরল না। তারা আবার পার্কে ফিরে এলো।

হায়দারের সার্চ করা শেষ। এখন তাকে একবার ডেড বডি দেখতে হবে। জগজিৎ বাবু বলল জয়ন্ত বাবুর লাশ এসে পৌঁছবে সকাল ৮টা নাগাদ। আমরা এখন জয়ন্ত বাবুর বাড়িতে রওনা দিলে যেতে যেতে ওদেরও আসার সময় হয়ে যাবে। হায়দার বলল তাহলে তাই করুন। সবাই আবার পুলিশের গাড়িতে করে নীড় মহলের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ওরা যাওয়ার একটু পরেই পুলিশের আরেকটি দল লাশ নিয়ে জয়ন্ত বাবুর বাড়িতে আসে। সবাই গিয়ে বৈঠকখানায় বসল।

রাকেশ বাবু এই শোকের মাঝেও যথাসম্ভব আপ্যায়ণ করলেন। পুলিশের ময়না তদন্তকারী কর্মকর্তা বলল শরীরে কোন ধস্তাধস্তির আলামত পাওয়া যায় নি। একবারে ডিরেক্ট শুট। হায়দার বলল আপনারা সবাই বসুন। আমি একটু লাশটা দেখে আসি। ডা. রাখি আপনিও চলুন আমার সাথে। রাখি আর হায়দার চলে গেল লাশের কাছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে লাশ দেখছে হায়দার। মুখটা খোলা তাতে বেশ কয়েকটা দাঁত দেখা যাচ্ছে। গুলিটা করা হয়েছিল পিছন দিক থেকে। পিঠ ভেদ করে হৃদপিণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করে সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে গুলি। চেহারা দেখেই বুঝা যায় ভদ্রলোক বেশ সুপুরুষ ছিলেন।

লাশের মাঝে আর কীইবা পাওয়া যাবে। অবশ্য ক্লু পাওয়ার আশায় আসে নি সে। শুধু লাশটাই দেখার জন্য এসেছে। হঠাৎ রাখি খোঁচা দিল হায়দারকে। দেখুন তো জয়ন্ত বাবুর সামনের পাটির একটা দাঁত ফলস টিথ মনে হচ্ছে। হায়দার বলল আপনি কি নিশ্চিত এটা ফলস টিথ? রাখি বলল আমার ডেন্টিস্ট লাইফের অভিজ্ঞতায় ৯০% নিশ্চিত এইটা ফলস টিথ। রাখির লেখা শেষ না হতেই একটানে দাঁতটা খুলে নিয়ে আসল হায়দার। তারপর সেটা পকেটে পুরে বলল ধন্যবাদ ডা. রাখি। গুরুত্বপূর্ণ আলামতের সন্ধান দিলেন।

ওরা আবার বৈঠকখানায় ফিরে আসল। দুপুর ১২টায় জয়ন্ত বাবুর লাশ সৎকার করা হবে। এখনও পর্যন্ত কোন কিছুর কুল কিনারা হয় নি। রাকেশ বাবু অজ্ঞাতনামা আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করবেন। জগজিৎ বাবু বলল মি. হায়দার কোন কিছুই তো ক্লিয়ার না। পুলিশের আরও অনেক সময় লাগবে। আপনার দিক থেকে কোন অগ্রগতি হল? হায়দার বলল কিছু সন্দেহ আর খটকা। ঐগুলা দূর হলেই আশা করি সব সমাধান হয়ে যাবে। যদি কোন সমাধানে যেতে পারি তাহলে রাতে আবার এ বাড়িতে ডাকব। আশা করি ফোন দিলেই চলে আসবেন। পুলিশ কমিশনার বলল অবশ্যই। আপনার জন্যও পুলিশের গাড়ি পৌঁছে যাবে। সবাই চলে আসল নীড় মহল থেকে।

হোটেলে ফিরে হায়দার রাখিকে বলল আমাকে একটু একা থাকতে দিন। অনেক কিছু চিন্তা ভাবনা করতে হবে। এ ফাঁকে আপনি শপিং করে নিতে পারেন। বলেই সে নিজের রুমে ফিরে এলো। প্রথমেই ড্রোনের মেমরি কার্ডের ফাইলগুলা নিয়া বসল। একটা ফাইল ওপেন করল। আকাশের অনেক উচ্চতায় ড্রোন উড়ছে। দিল্লী শহরের চমৎকার বার্ডস আই ভিউ দেখা যাচ্ছে। এরপর একটু ঘুরাঘুরি করেই ভিডিও শেষ। এরপর কাল সকালের ভিডিওটা ওপেন করল সে। ভিডিওর শেষ দিকে এসে চমকে গেল।

সামান্য একটা ড্রোনে যে এমন আলামত মিলবে স্বপ্নেও ভাবে নি সে। যে সন্দেহটা করেছিল সেটাই সত্য হতে যাচ্ছে। কিন্তু হীরাটা গেল কই? আরও ২ ঘণ্টা ধরে সব কিছু খতিয়ে খতিয়ে দেখল সে। এবার মাথাটা ক্লিয়ার। রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। এ তো অতি সহজ কেস। ছুটে গেল রাখির রুমে। কেস সলভড। আপনি পুলিশ কমিশনার জগজিতকে একটা ফোন করে জানিয়ে দিন রহস্য সমাধান হয়ে গেছে। সন্ধ্যা ৭টায় সবাইকে নিয়ে নীড় মহলে চলে আসতে বলেন। সাথে ঐ বাড়ির সবাই যেন থাকে। খুনি ঐ বাড়িতেই আছে। রাখি ফোন করে সব জানিয়ে দিল।

নীড় মহলের বৈঠকখানায় সবাই বসে আছে। রাকেশ বাবু, দুই সিকিউরিটি গার্ড, ড্রাইভার, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত। হায়দারের পাশের সিটে বসেছেন ডা. রাখি। হায়দার তার ল্যাপটপ খুলে বসল। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। হায়দার বলা শুরু করল – জয়ন্ত চক্রবর্তী খুন হন রবিবার সকালে। সেই সাথে দিল্লীর সুলতানি আমলের একটা মূল্যবান হীরা লোপাট হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে যে কারও মনে হত পারে এটা চুরি ছিনতাই। প্রথমে আমারও তাই মনে হয়েছিল। আমি প্রথমদিন এ বাড়িতে এসে সবাইকে জেরা করি। নিতিশ চোপড়ার হাতের একটা আংটি আমার বেশ নজর কাড়ে। অবশ্য আংটি পরতেই পারেন তিনি। তাতে দোষের কিছুই নাই। রাকেশ বাবুর বয়ান থেকে জানতে পারি নিলাম থেকে জয়ন্ত বাবু এই আংটিটি কিনেছিলেন প্রায় বছর খানেক আগে। আমার আবার আলোচিত সব খবরের লিংক বুকমার্ক করার অভ্যাস। স্পষ্টই মনে আছে দিল্লীর সুলতানি আমলের হীরার আলোচিত সেই নিলামের খবরের লিংক বুকমার্ক করেছিলাম।

যেহেতু এই হীরার সাথে জয়ন্ত বাবুর খুন জড়িয়ে আছে তাই আমি হোটেলে ফিরে সেই লিংকটা ওপেন করি। ফিচার ইমেজে ছিল টপ ৫ জন বিডারের ছবি। যিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিড করেছিলেন তার নাম ভগবান্দ শর্মা। বলেই ফিচার ইমেজটা সবাইকে দেখাল। জয়ন্ত বাবু সবার মাঝে হাস্যোজ্জলভাবে হীরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মি. চোপড়া বলুন তো ভগবান্দ শর্মার হাতের আংটি আর আপনার হাতের আংটির মাঝে মিল পান কিনা? ভগবান্দ শর্মার হাতের আংটিতে N লিখা। N এর একটা বাহু কাটা। আপনার হাতের আংটির N এর বাহুও কাটা।

চোপড়া বলল আংটির সাথে মিল থাকলেই তার মানেটা কী বলবেন কী? হায়দার বলল শুধু আংটি না অনেক কিছুর সাথে মিল আছে মি. চোপড়া। আমার অবশ্য রাকেশ বাবুকেও সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু তার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জেনেছি সে তরুণ উদ্যোক্তা। তার যে টাকা পয়সা আছে তাতে বাপের এই সামান্য জিনিষ চুরি করার দরকার হয় না। এবার হায়দার সোফা থেকে উঠে গিয়ে একটানে নিতিশ চোপড়ার নকল দাড়ি গোঁফ খুলে ফেলল। চোপড়ার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এবার বলুন তো মি. চোপড়া ছবির ভগবান্দ শর্মার সাথে আপনার চেহারার মিল খুঁজে পান কিনা?

সেই খবরে স্পষ্টই লিখা আছে আপনাদের মাঝে ৫০ বার বিড পাল্টা বিড হয়েছিল। আসলে এই হীরার দাম বড়জোর ১০ কোটি। আপনি ৫ কোটি বিড করেছিলেন। জয়ন্ত বাবু আপনাকে টেক্কা দেয়। এইভাবে টেক্কা দেওয়া চলতেই ছিল। শেষ পর্যন্ত জয়ন্ত বাবু ৫০ কোটি রুপি বিড করায় আপনি তার টাকার কাছে হেরে যান নিতিশ চোপড়া ওরফে ভগবান্দ শর্মা। কিন্তু এই পরাজয়কে আপনি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন নি। আপনার মাঝে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠে।

আপনি প্রতিশোধ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। মাস ২ পর জয়ন্ত বাবু সিকিউরিটি গার্ডের বিজ্ঞাপন দেন। আপনি নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে ফটোশপ দিয়ে ভুয়া আইডি কার্ড করে গার্ড হিসাবে যোগ দেন। আপনার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ নেওয়া। জয়ন্ত বাবু সরল মানুষ ছিলেন। তিনি আপনার এত কিছু যাচাই করে দেখেন নি। এরপর আপনি সুযোগ খুঁজতে থাকেন কখন হীরাটা চুরি করবেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরা থাকায় সেটা সম্ভব হয় নি। সম্ভবত একবার চুরি করার চেষ্টা করেছিলেন। জয়ন্ত বাবু সেটা বুঝতে পেরে হীরাটা লুকিয়ে ফেলেন।

নিতিশ চোপড়া ওরফে ভগবান্দ শর্মা বলল হ্যাঁ আমি ছদ্ম বেশে চাকরী নিয়েছি। সেদিনের পরাজয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি নি। কিন্তু তার মানে তো প্রমাণ হয় না আমি খুনি, চোর। হায়দার বলল আপনি চোর নন তবে খুনি। কারণ জয়ন্ত বাবু হীরাটা যেই জায়গায় রেখেছিল তাতে আপনার পক্ষে সম্ভব ছিল না সেটা চুরি করার। তাই আপনি হীরার আশা বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন খুন করবেন। এরপর সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সেদিন আপনি নিতাইকে পানির সাথে ঘুমের ঔষধ দিয়েছিলেন। সেই পানি খেয়ে বেচারা তখন চেয়ারেই ঘুমিয়ে পরে। আপনি সেই ফাঁকে পার্কের পিছন দিয়ে গিয়ে জয়ন্ত বাবুকে গুলি করেন। তারপর আবার দ্রুত গেটে ফিরে আসেন।

তখনও নিতাইয়ের ঘুম ভাঙ্গে নি। ভগবান্দ শর্মা বলল আবোল তাবোল বলছেন আপনি। প্রমাণ কী আমি খুন করেছি? হায়দার বলল প্রমাণ আছে মি. শর্মা একবারে ভিডিও প্রমাণ আছে। আপনি যখন পার্কে ঢুকেন তখন সেখানে এক পিচ্চি ড্রোন উড়াচ্ছিল। ড্রোনটি তখন ল্যান্ডিং করার জন্য নিচে নামতেছিল। নামার পথে আপনার খুনের ব্যাপারটাও ভিডিও করে ফেলে। কিন্তু আপনি তা জানতেন না। কাল আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু পিচ্চিকে ড্রোন উড়াতে দেখে মনে খটকা লাগে যে ওরা কাল সকালেও ড্রোন উড়িয়েছে। সেই ভেবেই এক পিচ্চির ড্রোনের মেমরি কার্ড কপি করে নিয়ে আসি। এতে যে এমন দিবা রাত্রীর ন্যয় স্পষ্ট প্রমাণ থাকবে তা আমিও ভাবি নি। নকল দাড়ি, গোঁফ ফেলে দিয়ে আসল শর্মার বেশে পার্কে এসেছিলেন। এরপর পরে আবার দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে নেন।

এবার হায়দার তার ল্যাপটপ থেকে ড্রোনের করা ভিডিওটা সবাইকে দেখাল। ভিডিও পুরাপুরি ক্লিয়ার না। তবে জয়ন্ত বাবুকে গুলি করা লোকটা যে ভগবান্দ শর্মা সেটা স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে। ভিডিও দেখে দরদর করে ঘামতে লাগলেন মি. শর্মা। দুইজন পুলিশ তার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দিল। রাকেশ বাবু বলল তাহলে হীরাটা গেল কই? হায়দার বলল উত্তেজিত হবেন না। এইটা আমার কাছেই আছে। হীরাটা যে উদ্ধার হয়েছে সেটার বড় কৃতিত্ব ডা. রাখির। তা না হলে হীরা এতক্ষণে জয়ন্ত বাবুর লাশের সাথে মাটির নিচে চলে যেত। তিনিই প্রথম তার ডেন্টাল লাইফের অভিজ্ঞতায় শনাক্ত করেন জয়ন্ত বাবুর একটা দাঁত ফলস টিথ। ভদ্রলোকের বয়স বেশি ছিল না।

তিনি ফলস টিথ পরার কথা না। সেটাই আমার মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়। আমি দাঁতটা খুলে নিয়ে আসি। এরপর কিছুক্ষণ ঘষাঘষি করতেই শুরু হয়ে হীরার ঝলকানি। আসলে ভগবান্দ শর্মা হীরাটা চুরি করার চেষ্টা করেছিলেন। সেটা বুঝতে পেরে জয়ন্ত বাবু হীরার উপর ফ্লোরাইডের প্রলেপ দিয়ে দাঁতের মত করে নিয়েছিলেন। তারপর ডেন্টিস্টের সাহায্যে নড়বড়ে একটা দাঁত তুলে হীরাটা সেটে নিয়েছিলেন। কারও বুঝার সাধ্যি ছিল না তার মুখের ভিতর মূল্যবান একটা হীরা নিয়ে ঘুরেন। বলেই হায়দার পকেট থেকে হীরাটা বের করে রাকেশের হাতে তুলে দিল। পুলিশ তখন ভগবান্দ শর্মাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলছে। আর রাকেশের হাতে ঝলমল করছে সুলতানি আমলের হীরা।


গল্পটি লিখেছেন অতিথি লেখকঃ মাসুদ সরকার রানা। মাসুদ রানা একজন প্রফেশনাল আর্টিকেল রাইটার। তিনি বিভিন্ন ব্লগে পত্রিকায় বাংলা ও ইংরেজি আর্টিকেল লিখেন।