বাই-সাইকেল, ছোট বেলায় যখন সমবয়সী সবাই মোটরবাইকের স্বপ্ন দেখত তখন আমি একটা বাই-সাইকেলের স্বপ্ন দেখতাম। আমি আমার পুরো ছোটবেলাটাই কাটিয়েছি মামার বাড়িতে। মামা বাড়িতে সবাই আদর করলেও, নিজের বাড়ির মতো কি আর সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়…

আমি মামা বাড়িতে একাই থাকতাম, আর আম্মু-আব্বু-ছোট ভাই তারা সিরাজগঞ্জে থাকতো। আব্বু বাড়ি থেকে রাগ করে চলে আসার পর আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই করুণ। বাই-সাইকেল? আমার লেখাপড়ার খরচ চালানো কষ্টকর হবে জন্য, আমি আমার ছোটবেলাটা ফ্যামিলির সাথেই থাকা হয়নি। এটা নিয়ে আমার মনে কোন দুঃখ ছিল না, সংসারের বড় ছেলে হয়ে এটা মেনে নেয়া আমার দায়িত্ব।

মামাতো ভাইদের সবারই সাইকেল ছিল, আর আমরা (আমি আর ৩ মামাতো ভাই এবং ১ মামাতো বোন) একই ক্লাসে পড়তাম। এক মামাতো ভাই তার বোন মানে আমার মামাতো বোনকে সাইকেলে নিয়ে স্কুলে যেত। আর বাকি ২ ভাই? এই যায়গায় আমি সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছি। ওরা কখনোই আমাকে ওদের সাইকেলে করে নিয়ে যেতো না। একা একা ৪ কিলোমিটার হেটে হেটে স্কুলের দিকে পা বাড়াতাম। কোন কোনোদিন নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসতো।

আবার মামাতো ভাইদের কথা বলতে হচ্ছে, ওরা সর্বচ্চো ব্যবহার দেখিয়েছে আশেপাশের সহপাঠীদের সাইকেলে করে নিয়ে গিয়ে। আমি এখনো মনে মনে হাসি, ফুফাতো ভাইয়ের থেকে প্রতিবেশীরাই ওদের নিকট বেশী আপন ছিল। আমি ওদের মধ্যে বা আমাদের ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলাম। আর যেহেতু অন্যের বাড়িতে থাকি, সেহেতু সবসময় ছোটই হয়ে থাকতে হতো।

আমি প্রথম সাইকেল কিনি বা পাই ক্লাস এইটে থাকতে। আব্বু ৩০০ টাকা দিয়ে একটা পুরাতন সাইকেল কিনে সেটা রিপেয়ার করে দিয়েছিলেন। আমি জানি এটাই আব্বুর কাছে অনেক জুলুমের ছিল। মোটামুটি চালানো যায় এরকম একটা সাইকেল পেয়েই আমি যেমন খুশি হয়েছিলাম, তা মনে হয়ে এখন বাইক কিনলেও পাবো না।

সবচেয়ে মজার কথা হল আমার ৩য় মামার ছেলে যে কখনোই আমাকে সাইকেলে নিতো না বা আমাকে কখনোই তার সাথে মিশতে দিত না, তার আমার সাইকেলের প্রতি বিশেষ টান অনুভব করলাম। এবং আম্মুর কাছ থেকে প্রতিদিন আমাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসার মহান দায়িত্বও কাধে তুলে নিলো। তখন ওর নিজের কোন সাইকেল ছিল না। আমি তখন মনে মনে মিটিমিটি হেসেছিলাম, আর একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমাকে একদিন ওদের উপরে যেতেই হবে। আল্লাহ তায়লার রহমতে হয়তো সেইদিন আর বেশী দূরে নেই। মামাদের সম্পত্তির হিসাব বাদ দিলে আল্লাহ তায়লার রহমতে ওদের কয়েকগুন উপরে আমি এখনই রয়েছি। অবশ্য প্রথমদিন স্কুলে যাওয়ার সমই শুধু ওকে সাইকেলে নিয়ে গিয়েছিলাম, এরপরে আর ওকে সাইকেলের আশেপাশে (স্কুলে যাওয়ার সময়) নেই নি।

যাই হোক, এখন মামাতো ভাইদের সাথে আমার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।

স্রতিচারন করতে গিয়ে অনেক গভীরের কথা বলে ফেলেছি। মামাতো ভাইরা যদি কখনো ব্লগটা পরে, হয়তো কষ্ট পেতে পারে। কিন্তু কি আর করা যাবে, এখন তারা অনেক ভালো।

যাইহোক সাইকেলে আমার একমাত্র দুর্ঘটনা সম্পর্কে লিখছি…

সাইকেলে দুর্ঘটনা

প্রথম প্রথম সাইকেল পাওয়ার পর সারাদিনই সাইকেল নিয়ে ঘুরতাম। একদিন বাজার থেকে একটা আইসক্রিম কিনে খেতে আসছি। না, চকবার না। ১ টাকা দামের “কোন” আইসক্রিম। ময়দার কোনের ভিতরে বরফের গুড়ো দেয়া থাকতো। ওগুলো আমরা নিচের দিকে ফুটো করে চুষে চুষে খেতাম। যাইহোক, একহাতে সাইকেল ধরে আরেক হাতে আইক্রিম ধরে খেতে খেতে চালাচ্ছিলাম। হটাত করে আইসক্রিম পরে যাওয়ার উপক্রম হতেই আমি দুই হাত দিয়ে আইসক্রিমটা ধরে ফেললাম। যাক আইসক্রিমটা বেচে গেলো, কিন্তু আমি রাস্তা থেকে ২ হাত নিচু আখের খেতে পরে আছি। হতভম্ব ভাব কেটে যেতেই নিজের শরীরের সবকিছু ঠিক আছে কিনা দেখা বাদ দিয়ে আমি সাইকেলের শরীর দেখা শুরু করেছিলাম।

আল্লাহ তায়লার রহমতে আমার ওইদিন কোনপ্রকার ক্ষতি হয়নি।